সাহিত্য ও কবিতা

ময়না তদন্ত | পুলক বড়ুয়া

ময়না তদন্ত | পুলক বড়ুয়া


ছোট্ট হাত । ছোট্ট পা । ছোট্ট দেহ ।
আমি মুনিয়া পাখি ।
ছোট্ট একটা পাখি ।

আমি ক্ষুদ্র পাখি হলে কী করব ।
আমি ক্ষুদ্র পাখি হলে কী আর করা ।
আমি ক্ষুদ্র পাখি হলে আর কী করা ।
আমারও মন রাঙা হয় । স্বপ্ন দেখি ‌।
কল্পনার ডানা মেলে তাকাই
ওড়াওড়ি করি । ঘোরাঘুরি করি ।
শিকারীর লোভী জালে অধরা
আমি ধরা পড়ি, ধরা দিই ।

ছোট্ট একটা বুক । কোমল হৃদয় ।
হঠাৎ ঝড়ে ও ঝঞ্ঝায় খড়খুটোর মতোন বর্ণাঢ্য আশা
ফিকে হয়ে ভেসে গেলে, উড়ে গেলে, ভেঙে গেলে—শূন্য বসতবাটির মতোন মন খা খা করে, হাহাকার করে ওঠে। ধূলিসাৎ হয়ে যায় ।
মিথ্যে মায়া-মরীচিকার মতোন তখন আলো নিভে আসে,
সবকিছু অনন্ত অন্ধকার—নরক মনে হয়

এ শহরে গৃহহীন, অভিভাবকহীন ।
মা-বাবা দূর অস্ত ।
আমি হীনবল । দুর্বল প্রজাতি ।
আশেপাশে, ঝোপঝাড়ে, গ্রাম ও নগরে আমার বসতি ।
মোটের উপর, আমি মোটেও শহুরে নই !
বিশাল বাংলায় আমি উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে আছি, থাকি;
তথাপি, এই দেশটা তোমাদের, আমি নামে মাত্র ।
আমি সামান্য পাখি, তোমাদের অসামান্য আঁখিতে—
নয়ন-নন্দনে বিনোদন-শোভন মাত্র ।
আমি কী নাগরিক ? আমি তো মানুষ নই ।
যখন দেশহীন মানুষের গল্প শোনার কেউ নেই,
সেখানে আমি বড়জোর অচেনা-আগুন্তুক মাত্র ।

মুই কী হনু রে !

তোমরা যারা বড় । বড় লোক ।
বড় মাপের মানুষ । মস্ত বড় মানুষ ।
ইচ্ছে হলে, কিনতে পার । খাঁচায় পুষতে পার ।
খাঁচা ভরে রাখতে পার ।
তোমাদের কোনো অসুবিধে নেই ।
তোমরা অভিজাত পাড়ায় অনায়াসে সুন্দর
লাখ টাকার খাঁচায় পুষতে পার, রাখতে পার আমাকে ।
তোমাদের কোনো বাধা নেই ।
তোমাদের শখ-সোহাগ বিচিত্র । আমি বন্দি ।
তোমাদের হাতের তালুর মতো এই সীমাবদ্ধ
তালুকের বাইরে আমি কোনদিকে যেতে পারব না ।
আমি বিহঙ্গ হলেও আজ বন্দিনী ।

অথচ, ইচ্ছে হলেই তোমরা যে কোনো দিকে খুশি মতো চলে যেতে পার, উড্ডীন হতে পার।
তোমাদের কত পাসপোর্ট-ভিসা !
আজন্ম ডানার মতো
তোমাদের দুই হাত স্বয়ং পাসপোর্ট-ভিসা—
আমার পিঞ্জরে বসিয়া সুখ !
আমি তোমাদের কৌশলী-উপভোগ ।

এই দেহ থেকে প্রাণপাখি উড়ে গেলে,
তার কার্যকারণ-কৈফিয়ত-সাক্ষ্য-প্রমাণ-আলামত
নিস্তরঙ্গ আমার ভেতর থেকে
যেমন ইচ্ছে সাজাও বাধা দেব না ।
ময়না তদন্তের নামে এই আমাকেই আসামির
কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দাও । আমি সেই খুদে পাখি ।
আমি জানি, বিচারের নামে থাকবে না বাকি—
শুভঙ্করের ভয়ঙ্কর ফাঁকি !

অতএব, আমার আমাকেই আমি
একাকী দোষী সাব্যস্ত করে গেলাম—
এক আশ্চর্য আত্মদহনে, দগ্ধহননে ‌।

তোমাদের একি অসহায় বিচার—একেই বলে প্রহসন :
আমাকে বদলে ফেল—

ব্যবচ্ছেদে !
                    ব্যবচ্ছেদে !!
                                          ব্যবচ্ছেদে !!!

কী সুন্দর আরোপিত কন্ঠ, শুনব এখন !


আপনার মন্তব্য লিখুন