ফিচার্ড লেখালেখি

অতীতের ডায়েরী থেকে – সীমান্ত রেখা | সুশীল কুমার পোদ্দার

অতীতের ডায়েরী থেকে – সীমান্ত রেখা | সুশীল কুমার পোদ্দার

সেই শৈশবের কথা । মনে হয় কেবল সপ্তম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণিতে উঠেছি। মধ্যবিত্ত পরিবারে আমাদের কারো ভাগ্যে তখন নতুন বই জুটতো না। অথচ নতুন বইয়ের প্রতি ছিল আমার দুর্বার আকর্ষণ। নতুন বইয়ের গন্ধ আমায় চিরকাল আত্মহারা করে দেয়। অগত্যা খুঁজতে খুঁজতে বেশ সস্তা দামে এক সেট বই পেয়ে যাই। বেশ কিছু বই প্রায় নতুন। আমার আনন্দের সীমা নেই। বই গুলো সোভিয়েত ইউনিয়নের মাসিক পত্রিকার বর্ণময় কাগজ দিয়ে সযতনে মুড়ে ফেলি। প্রথম পাতায় লিখে ফেলি স্পষ্ট করে নিজের নাম। যেন আর বিলম্ব সহে না। সবচেয়ে নতুন বইগুলো আগে বেছে ফেলি। আমার বেছে ফেলা সারির মধ্যে ভূগোল বইটা অন্যতম। আমি বইয়ের পৃষ্ঠাগুলো উল্টিয়ে যাই। হঠাৎ চোখ থমকে যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রের উপর । উত্তরে হিমালয় কন্যা নেপাল, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, বার্মা (মিয়ানমার), পূর্বপশ্চিমে ভারতের সুবিস্তীর্ণ অঞ্চল দিয়ে ঘেরা আমার এ দেশটার রেখাছবি আমায় কেমন যেন আনমনা করে দেয়। যেখানে মাটি সাগরের সাথে মিশে গেছে, যেথায় দুদেশের সীমানা রেখা দুটো দেশকে বিভাজিত করেছে, আমার দৃষ্টি থেমে যায় ঐ আঁকাবাঁকা রেখাগুলোর উপর। আমি কল্পনায় কতোদিন ঐ আঁকাবাঁকা রেখাগুলোর উপর দিয়ে হেঁটে গেছি। মনে মনে ভেবেছি – আচ্ছা আমি ঐ রেখাগুলোর উপর দিয়ে হাটতে হাটতে যদি পা পিছলে পড়ে যাই অপর প্রান্তে, তাহলে কি অনুপ্রবেশ করবো অন্য কোন এক দেশে? আচ্ছা আমি কেমন করে বুঝবো ওটা এক ভিন্ন দেশ? মাটি কি হঠাৎ করে তার বর্ণ পরিবর্তন করে ধরা দেবে আমার কাছে? প্রকৃতি কি নতুন রূপে, পাখিরা কি নতুন সুরে করিবে কুজন?

আমি কি বোকা ছিলেম ! মানুষ কতো ছোট বয়সেই বুঝে যায় জগৎ জীবনের কতো নিগুঢ় কথা। অথচ আমি ঐ কল্পনা নিয়ে কাটিয়ে দেই অনেকটা সময়। একদিন সময় আসে। বাবা-মা ভারত থেকে ফিরে আসছেন দিদির সাথে দেখা করে। দর্শনা চেক পোস্ট। দুই বাংলার মাঝে একটা বিরতি স্থল। আমি আমার এক দাদার সাথে গিয়েছি বাবা-মাকে আনার জন্য। আমরা অপেক্ষা করছি দীর্ঘ সময় ওনাদের আসার প্রতীক্ষায়। আমার চোখ খুঁজে বেড়ায় – কোথায় সে বিভাজিত রেখা – যা বিভক্ত করেছে দুই ভিন্ন জনপদকে? কোথা গেলে দেখতে পারবো ফুল, ফল, বৃক্ষ লতার ভিন্ন অবয়ব? আমি হেটে চলি । আরও দূরে, দূরে। একটা বিশাল বটবৃক্ষের নিচে অনেক গুলো মানুষ শুয়ে বসে আছে। আমার মন চায় ওদেরকে জিজ্ঞেস করি আর কতো দূর গেলে আমি স্পর্শ করতে পারবো সীমান্ত রেখাকে, আর কতো দূর গেলে বুঝতে পারবো ঐ তো এক ভিন্ন দেশ ! কিন্তু লজ্জায় বলতে পারিনে। হেটে চলি। হঠাৎ করে কে যেন আমায় পেছন থেকে জোরে টেনে ধরে। আমি ভীত, সন্ত্রস্ত। আমি জানি কান্না করার বয়স আমার অনেক আগেই অতিক্রান্ত হয়েছে। তবু কান্না আসে। বিডিআর জোয়ানটা অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করতে করতে আমায় টেনে নিয়ে আসে সীমান্ত চৌকিতে। আমার মামাতো ভাইটার সাথে ওদের অনেক কথা হয়। নিছক বোকা ভেবে ওরা আমার গায়ে হাত দেয় না। শুধু একটা ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে চুপটি করে বসে থাকতে বলে। বাবা-মা এলে পরিচয় নিয়েই নাকি আমায় ছাড়বে। আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকি বাবা-মার আসার পথ চেয়ে।

তার পর কতো দিন পার হয়ে গেছে। বড়দার চাকরীর সুবাদে সীমান্ত এলাকায় কতো ঘুরে বেড়িয়েছি, কতো বার ইচ্ছাকৃত ভাবে সীমান্ত পার হয়ে পৌঁছে গেছি ভারতের সীমান্তবর্তী গ্রামে। কোথায় সেই আঁকাবাঁকা রেখা, কোথায় সেই প্রকৃতির বিভাজন ! মানব সৃষ্ট এ আঁকাবাঁকা রেখাগুলো আজও আমায় একই ভাবে আনমনা করে। আজ যখন আকাশ পথে পারি দেই এক দেশ থেকে আরেক দেশ, তাকিয়ে থাকি একি আগ্রহ নিয়ে ক্রম ক্ষুদ্র হয়ে আসা জনপদের দিকে, প্রকৃতির দিকে।

আপনার মন্তব্য লিখুন